1. admin@idealmediabd.com : Sultan Mahmud : Sultan Mahmud
গল্প 'ভাগ্য'। পর্ব-১। - ইত্তেহাদ টাইমস
শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১, ১২:২১ অপরাহ্ন
শিরোনাম:

গল্প ‘ভাগ্য’। পর্ব-১।

মাওলানা হুসাইন আহমদ কামাল
  • প্রকাশটাইম: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০

হুসাইন কামাল

রফিকের এ কথা জানা ছিলোনা বলেই আজ এতো অপমান সইতে হলো। রফিক পাথরের মতো দাঁড়িয়েছিল। আর ভাবছিলো গরিবের ঘরে তার যদি জন্ম না-হয়ে ধনী বাপের সন্তান হতো তাহলে আজ হোটেলে মেসিয়ারের কাজ করতে এসে বড়লোকের এ অপমান সহ্য করতে হতো না।
তেরো কিবা চৌদ্দ বছরের রফিক। সে আন-লাকী থার্টিও বুঝেনা।বয়সের হিসেবটাও পুরাপুরি জানেনা।তার মায় বলছে। এই তার জানা হয়েছে।স্কুলে যদি নিয়মিত ক্লাস করতো তাহলে না হয় বুঝতো।
তার বাবা মারা যায় এক মর্মান্তিক লোমহর্ষক হৃদয়বিদারক ঘটনায়।সুনামগঞ্জের সদর থানার লাগোয়া একটি গ্রামের নাম বীজতলা। সেখানে দুই হাজার সাত সালে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় প্রভাবশালী দু নেতার মাঝে বাকবিতন্ডা হয়।এর জের ধরে সাঙ্গপাঙ্গরা দিবালোকে ধারালো মারণাস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দিতে থাকে।জনসাধারণের জানমালের তোয়াক্কা না করে দিনে রাতে বিভিন্ন রকমে একপক্ষ অপরপক্ষকে ভয়ভীতি দেখাতে থাকে।শহরের দুই প্রান্তে দু নেতার বাস।বিধায় পুরো শহর জুড়ে ভয়ানক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।একদিন হঠাৎ গুলির শব্দ শুনা যায়।প্রচন্ড আওয়াজে ঘরের ভেতরের মানুষগুলোও আঁতকে ওঠে।গলির ভেতর দৌড়াদৌড়ির পদশব্দ। মনে হচ্ছে কেয়ামত শুরু হয়েছে।কেউ জানেনা কোন মায়ের বুক খালি হচ্ছে।আজ ক’জন নারী বিধবা হলেন।
এটা শুধু এ অঞ্চলেরই চিত্র নয়,আমাদের দেশের নষ্ট রাজনীতির এক ভয়াল রুপ ইহা।
সেদিনের ঘাত প্রতিঘাতে আচমকা একটি বুলেট এসে রফিকের বাবার বুকে বিদ্ধ হলো।সাথে সাথে বাড়ীর সম্মুখ রাস্তার একপাশে লুটিয়ে পড়ে প্রাণ হারালো।রফিক তখন তিন বছরের নাবালক ছেলে।বাবা হারানোর বিয়োগ ব্যাথা তখনও সে বুঝতে পারেনি।রফিকের মা আয়েশা তখন ছিলো ছ’মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীর করুণ অপমৃত্যুতে বারবার মুর্ছা যাচ্ছে।রফিকের আবছা আবছা মনে পড়ে মায়ের সেদিনের গগন বিদারী চিৎকার আর মুর্ছা যাওয়ার কথা।
তিনমাস পর রফিকের মা আয়েশা ফুটফুটে একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেন। নাম রাখেন নূরী।রফিক আর নূরীকে নিয়েই আয়েশার জীবন।প্রথম প্রথম এলাকার মানুষের দান-খয়রাতের দ্বারা মোটামুটি চলছিলো তাদের ছোট্ট সংসার।কেননা রফিকের বাবা গরীব হলেও তার আত্মীয় স্বজনেরা মধ্যবিত্তের লোক।বংশীয় মর্যাদায় ওরা উচু খান্দানী।খান্দানের সবাই সাহায্য সহযোগিতা করে কিছুদিন সংসারের ভরণপোষণ করেণ।কিন্তু বিভিন্ন জনের ভিন্ন মন্তব্যে সত্য মিথ্যা কথার মারপ্যাচে শেষ পর্যন্ত সবাই হাত গুটিয়ে নেয় ভরণপোষণ থেকে। মানুষ এমনই। মনের কোনে যখন সন্দেহের দানা বাঁধতে থাকে তখন সত্য মিথ্যার মানদন্ডে বিচার না করে বিচারটা হয় জনশ্রুতির মুখের ভাষ্যের উপরে।রফিক দেখেছে তার মায়ের আহাজারি আর কান্নার রোল।
শেষতক আয়েশা বেগম বাধ্য হয়ে ঝিয়ের কাজের টাকা বা খাদ্য দিয়ে রফিকদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা হলো।তাও আবার শহরে।শহরতলীতে তাকে কেউ কাজ দেয়না।দুধের শিশু নূরীকে কুলে করে বাসার একাজ ওকাজ করে বিকেল বেলা বাড়ী ফিরতো।এজন্য রফিকের লেখাপড়া হয়ে ওঠেনি। মক্তবের পড়ায় আর কতো দূর চলে! তাই ভালো কোনো দোকানে চাকরি করতে হলে ম্যালা পড়ালেখার দরকার। রফিকের ওতো পড়া না থাকায় রেস্টুরেন্টে মেসিয়ারের কাজ জুটেছে। বেতনটাও খুব অল্প।তারপরও ভালো এই যে শেষে একটা কাজ জুটলো।নূরীকে পড়াতে হবে।রফিকের স্বপ্ন এটা।যে করেই হোক তার বোনকে সে পড়াবে।মার শরীরটাও বেশ ভালো নেই।পরের ঘরে কাজ কর্ম করে অল্প বয়সেই শরীরে ধরেছে। মায়ের ওষুধ করাতে পারেনি। শহরের সরকারী হাসপাতালে নিয়ে মায়ের চিকিৎসা করেছে।কিন্তু টাকার অভাবে ঠিকমতো ওষুধ কিনতে পারেনি। সরকারী প্যারাসিটামল খেয়ে ক’দিন আর সুস্থ থাকা যায়! তাই তার মায়েরও চিকিৎসা করাতে হবে।রফিক এ স্বপ্ন নিয়ে সিলেট শহরে আসছে কাজের তালাশে।তাকে কাজ করতে হবে।ম্যালা টাকা কামাতে হবে।নূরীর লেখাপড়া আর মায়ের ভালো চিকিৎসা করাতে হলে ম্যালা টাকার দরকার। রফিক শেষমেশ মেসিয়ার হয়ে একটি রেস্টুরেন্টে আশ্রয় পেয়েছে।আপাতত তার এই-ই শান্তনার আশ্রয় স্থল।ভালো কোন দোকানে কাজ করতে হলে বেশ পড়াশোনা করার দরকার। তার তো লেখাপড়া নাই। কী দিয়ে সে বড়ো দোকানে কাজ পাবে! যোগ্যতা বলতে তার কিছুই নাই।লেখাপড়া কিংবা কাজেরও কোন কিছুরই যোগ্যতা নাই।রফিক এই মেসিয়ারের কাজেই নিজেকে সপে দিয়েছে।এখানে থেকেই স্বপ্ন দেখে যায়।সে স্বপ্ন তার মা ও বোনকে নিয়ে।রফিকের দুনিয়া তাদেরকে নিয়েই।এর বাইরের দুনিয়ার সাথে সে পরিচিত নয়।
আজ পরিচিত হয়েছে। এমন অপমান সহ্যের বাইরে। রফিক এতো বড়ো হয়েছে অপমান তো দূরের কথা কখনও তার গায়ে হাত ওঠেনি।বড়লোকের শক্ত হাতের কঠিন থাপ্পড় রফিকের নরম গালে ভীষণ কষ্ট দিলো! এ যেনো হতদরিদ্র, গরিব লোকের গ্রামের গায়ে ধনী শহরের চপেটাঘাত! রফিক চড় খেয়ে নিরবে অপমান সহ্য করে এখান থেকে সরে গেলো।
সারা রাত ঘুমোতে পারেনি! এপাশ-ওপাশ করে রফিক রাতটি কাটিয়ে দিলো।মনের মধ্যে একটাই চিন্তা টাকা রুজি করতে হবে। যে করেই হোক তার টাকার দরকার।পরের দিন আনমনা হয়ে কাজ করলো সারাদিন। মেসিয়ারের কাজে বকশিস নেই।ওয়েটারের জন্য বকশিস মিলে।হাত খরচের টাকা মালিক দয়া ভেবে মাঝেমধ্যে দেয়। তা দিয়ে শহরটা ঘুরে দেখে।রফিক দেখেছে শহরের কীনব্রিজের নীচে তার বয়সী অনেক ছেলেকে খালি গায়ে শুয়ে থাকতে। কেউ কেউরে রিকশা ঠেলতেও দেখেছে।সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হলো এরা সারাদিন পরিশ্রম করে ফুটপাতের সস্তা খাবার খেয়ে সারারাত শহরের অলিগলির বারান্দায় মাথার নীচে ইট দিয়ে শুয়ে থাকে।তাদের ঘুম ঠিক মতো হয় কি না তার আর জানা হয়না।
রফিকের এলোমেলো মনে আজকের দিনটি কাটালো। তৃতীয় দিন তার জ্বর এলো।ভীষণ জ্বর।কাজ করতে পারলো না টানা পাঁচদিন।
এ ক’দিন তার মায়ের কথা খুব মনে পড়েছে।কে জানে ছোট বোন নূরী কেমন আছে! স্কুলে যায় কি না। রফিক বাড়ী থেকে বের হয়েছে আজ তিন মাস চলছে। রেস্টুরেন্টের মালিককে বললো জনাব আমি বাড়ী যাবো। আমাকে টাকা দিলে বেশ ভালো হবে। কারণ অসুস্থ মা আর নূরী কেমন আছে জানা নেই। মালিক বললো কেনরে রফিক তোর মায়ের কাছে মোবাইল নেই।মোবাইল করে জেনে নেয়। এখন যাবার দরকার নেই। সামনের মাসে যাবে।
– না মালিক আমার মায়ের মোবাইল নেই।আশপাশের কারো ঘরেও মোবাইল নেই।দু একজন পুরুষ মানুষের কাছে থাকলেও তাদের নম্বর আমার জানা নেই।
কী কয় রফিকে?এই মডার্ন যুগেও তোদের বাসায় মোবাইল নেই! ইহা বিশ্বাস করতে বলিস আমাকে?
মিথ্যা বলছিস।তোদেরকে বিশ্বাস করতে নেই।তোদের ব্যাপারে আমার জানা আছে। রফিক শুন, আমি এক টাকাও দিতে পারবো না। থাকলে দেখবো। তোর মন চাইলে চলে যেতে পারিস। নতুবা আগামী মাসে দেখা যাবে টাকা পয়সা দেয়া যায় কি না।

চলবে…..

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
copyright 2020: ittehadtimes24.com
Theme Customized BY MD Maruf Zakir