1. admin@idealmediabd.com : Sultan Mahmud : Sultan Mahmud
মক্কার এক ধার্মিক যুবকের গল্প - ইত্তেহাদ টাইমস
শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:২১ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার অর্জনে সরকার বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে : সিলেট বিভাগীয় কমিশনার শনিবার মাওলানা আব্দুল মতীন ফাউন্ডেশন সিলেটের শীতবস্ত্র বিতরণ মতবিরোধ পরিহার করে মুসলিমদের এক হওয়ার ডাক দিলেন এরদোগান ট্রাম্প সহিংসতা উসকে দিচ্ছেন, দায় তাকেই নিতে হবে: নির্বাচনী কর্মকর্তা দেশে করোনাভাইরাসে আরও ৩৮ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ২১৯৮ বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান এবার উন্মুক্ত স্থানে নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করোনায় দেশে গত ২৪ ঘন্টায় আরও ৩১ মৃত্যু, শনাক্ত ২২৯৩ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর রোগমুক্তি কামনায় গোয়াইনঘাট গ্রাম পুলিশের মিলাদ মাহফিল সাঈদুর রহমান লিটনের কবিতা “ফুলকি” দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তাখাসসুসের মাদরাসা প্রতিষ্ঠা জরুরি : আল্লামা আলিমুদ্দিন দুর্লভপুরী

মক্কার এক ধার্মিক যুবকের গল্প

আখলাক তারেক
  • প্রকাশটাইম: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২০
নব যৌবনে পদার্পণকারী যুবক নাম তার আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ । সরল প্রকৃতি আর মহানুভবতা যার নিত্য সঙ্গী । মায়ের আদুরী সন্তান । তবে সে স্বপ্নবিলাসী তাই উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে লেখা-পড়া করে ভবিষ্যত গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের ইচ্ছায় ইউরোপের ফ্রান্সকে বেছে নেয়। তাই প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র পাঠিয়ে অপেক্ষায় দিন গণনা করছিল।
হঠাৎ একদিন তার সেই কাঙ্ক্ষিত সোনালী স্বপ্ন বাস্তবায়নের খবর চলে আসলো। খবরটি শুনে সে আনন্দে আত্মহারা হলো এবং সৌভাগ্যের পথে উড়াল দিতে উদ্যোত হলো।  সে নিজেকে সারা দুনিয়ার মালিক হিসেবে দেখতে পেলো। তার পরিবারের লোকদের মাঝে আনন্দের জোয়ার বইতে লাগলো এবং সকল কাজকর্মে ও অনুষ্ঠানে একই কথা বার বার ঘুরপাক খাচ্ছিল। তার মনেও আনন্দের শেষ নেই।
তার সামনে উন্মুক্ত হবে সারা দুনিয়া, সঙ্গী-সাথী ও সহপাঠির মাঝে সে হবে অদ্বিতীয়। সফরের সময় যতই নিকবর্তী হচ্ছে সে তত দ্রুত পোষাক-পরিচ্ছদ, কাগজ-পত্র ও প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র প্রস্তুত করায় মশগুল হচ্ছে।
কিন্তু একটি বিষয় তাকে কষ্ট দিচ্ছে, বিনিদ্র রজনী তাকে অস্থির করে তুলছে। তার মনে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি কিভাবে এই পবিত্র মক্কা থেকে বিচ্ছিন্ন হবো? দীর্ঘদিন আমি এখানে বসবাস করেছি, এখানে জন্মগ্রহণ করেছি, এখানেই বড় হয়েছি, পবিত্র মসজিদের আযানের ধ্বনি আমার ঘুম ভেঙ্গেছে, বিশ্ববিখ্যাত কারীদের কণ্ঠের কিরাআত আমাকে মুগ্ধ করেছে, কাবা ভালোবাসায় আমার অন্তরকে বেঁধে ফেলেছি, যমযমের মিঠা পানি আমাকে পরিতৃপ্ত করেছে, মক্কার পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকা আমার হৃদয়ে গভীর স্থান দখল করে নিয়েছে…..।
আর আমার স্নেহময়ী মাকে ভুলবো কিভাবে? আমার অনুপস্থিততে কে তার দেখাশুনা করবে। কে তাঁকে কাবায় প্রতিদিন নামায পড়তে নিয়ে যাবে? তবে আমার ভাইয়েরাও তার প্রতি যত্নশীল। কিন্তু তাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আমার মত নয়। এমনি আরো অনেক প্রশ্ন। যার কোনো জবাব নেই
যাক সেসব কথা।
যাই হোক, সফরের চূড়ান্ত সময় উপস্থিত হলে ব্যাগ হাতে নিয়ে সে রওয়ানা দিল। মায়ের হাত ও মাথায় চুমু খেয়ে বিদায় নিল, ভাইবোন ও বন্ধু-বান্ধবদেরকে বিদায় দিয়ে চোখের পানি মুছে মুছে পবিত্র ভূমি মক্কাকেও বিদায় জানালো।
বুক বিদীর্ণকারী ব্যথা নিয়েই সে যাত্রা করলো এবং অপরিচিত দেশ ফ্রান্সে গিয়ে পৌছলো।
.
ফ্রান্সের মাটিতে পা রাখতেই তার চোখে আলাদা একটি জগতের চিত্র ভেসে উঠলো। যার অবস্থা তার দেশের চিত্রের সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাস্তাঘাট, বিমান বন্দর, স্কুল-কলেজ ও অফিস-আদালতে নির্লজ উলঙ্গ-অর্ধালোঙ্গ মহিলাদের দিকে দৃষ্টিপাত করে সে হতবাক হলো। সেখানকার মহিলাদের অবমাননা ও মূল্যহীনতা অনুভব করলো। সেই সঙ্গে সীমাহীন বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা দেখে ঈমান, ইসলাম, সম্ভ্রম ও পবিত্রতার দেশের কথা মনে পড়লো।
যাই হোক লেখা-পড়ায় যোগদান করতে গিয়ে যখন উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদেরকে পাশাপাশি বসতে দেখলো, যুবতী মেয়েদেরকে অর্ধেক শরীর ঢেকে বাকী অর্ধেক উন্মুক্ত করে রেখে বসতে দেখলো, তখন সে আরেকটি ভয়ানক বিপদের সম্মুখীন হলো।
প্রথমতঃ সে লজ্জায় মাথা নীচু করে ক্লাসে প্রবেশ করতো। কথায় বলে বেশী বেশী স্পর্শ ও ঘেসাঘেসি তীব্র অনুভুতি বিলুপ্ত করে দেয়। সময়ের ব্যবধানে তার কাছে এ ভয়ানক দৃশ্য স্বাভাবিক হয়ে গেলো।
শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে সে ধীরে ধীরে তাদের দিকে তাকাতে অভ্যস্থ হয়ে গেলো। এক পর্যায়ে অর্ধ উলঙ্গ সমবয়সী নারীদের দিকে তাকিয়ে থাকা তার একমাত্র অভ্যাসে পরিণত হলো এবং তার ভিতরে প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকলো। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তার ফরাসী ভাষা শিখা হয়ে গেলো। যেসব কারণে সে কয়েকমাসের মধ্যে ফরাসী ভাষা আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছিল, তার মধ্যে সহপাঠী সুন্দরী নারীদের সাথে খোলামেলা কথা-বার্তা অন্যতম।
কয়েকমাস পরেই সে নীল চোখ বিশিষ্ট এক সুন্দরী নারীর প্রেমের জালে আটকা পড়লো। নারীটির প্রতি আসক্তি তাকে উন্মাদ করে ফেললো। তাকে ছাড়া এখন সে কিছুই বুঝেনা। মেয়েটির ফাঁদে পড়ে সে পবিত্র ভূমি মক্কা, মদীনা, কাবা, তার স্নেহময়ী মা, ভাইবোন সবাইকে ভুলে গেলো। এমনকি নামাযসহ ইসলামের মৌলিক বিধি-বিধানগুলো পালন করাও আস্তে সাতে ছেড়ে দিতে লাগলো ।।
.
একরাতে হঠাৎ যখন তার স্মৃতিপটে নিজ দেশের পবিত্র ঈমানী পরিবেশ, কাবার মিনার থেকে ভেসে আসা মুয়াজ্জিনের আল্লাহু আকবার ধ্বনি, হারাম শরীফের ইমামদের সুমধুর কোর’আন তিলাওয়াত, প্রতিদিন তার মাকে মসজিদে পৌছিয়ে দেয়ার স্মৃতি, মক্কা শরীফ ও কাবার প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা, দরদী মায়ের স্নেময় চাঁদমুখ ইত্যাদি ভেসে উঠলো, তখন তার পূর্বের অবস্থার সাথে বর্তমান অবস্থার বিরাট দূরত্ব অনুভব করে নিজেকে তুচ্ছ মনে করলো এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করলো। কিন্তু অভিশপ্ত ইবলীস তাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিতে মোটেই প্রস্তুত ছিলনা। যদিও সে বিবেকের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলো, একজন মুসলিম হিসেবে এসবকিছু হারাম জেনে সে তার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হলো, কিন্তু কুপ্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে শয়তানের প্ররোচনার সামনে টিকে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হলো না।
পরিস্থিতি এ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছালো যে, একরাতে মেয়েটি তাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেলো। সেখানে গিয়ে মেয়েটির অন্যান্য সুন্দরী বোনদেরকে তাদের পিতা-মাতার সামনেই দেখতে পেলো। তারা এমন এক জাতি, যাদের ভাষায় লজ্জা-শরম বলতে কিছু নেই।
এসব মেয়ে তাকে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেতে লাগলো এবং তাকে অশ্লীলতার চরম পর্যায়ে ঢুবিয়ে দিলো। প্রবৃত্তির লাগামহীন ঘোড়া ছুটিয়ে নিলর্জতা ও বেহায়াপনার প্রত্যেক দরজায় গমণ করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হতে লাগলো এবং হয়েগেল।
এখানেই শেষ নয় নষ্ট নারীরা তার কাছে তাদের গীর্জায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করলো এবং রবিবারের দিন তথায় তাদের এবাদতের নমুনা দেখানোর আশা প্রকাশ করলো। যাতে করে তারা তাকে দেখাতে তাদের পাদ্রীগণ কিভাবে তাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দিচ্ছেন। যাদুগ্রস্তের মত সে তাদের প্রস্তাব মেনে নিয়ে একদা দ্বিধা সংকোচসহ গীর্জার দরজায় গিয়ে দাড়ালো। মেয়েরা তাকে ইঙ্গিতের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলো, তুমিও আমাদের মত করো। এই বলে তারা তাদের বক্ষদেশে ঝুলন্ত ক্রুশ চিহ্নের দিকে হাত দ্বারা ইশারা করলো। অতঃপর যুবকটি হাত বাড়িয়ে তা গ্রহণ করে বুকে ধারণ করে গীর্জায় গিয়ে যা দেখলো, তাতে একজন গণ্ড মুর্খ লোকের সামনে বাতিল হিসেবে ধরা পরবে।
এভাবেই তার অবস্থা পরিবর্তন হলো। প্রবৃত্তির চাহিদা পুরণের মাধ্যমে তার জীবনের পতন শুরু এবং কুফুরী ও ধর্মত্যাগ পর্যন্ত গিয়ে শেষ হলো।
.
অতঃপর যখন লেখা-পড়া শেষ হলো এবং ফ্রান্স ত্যাগ করার সময় ঘনিয়ে আসলো, তখন তার সামনে মক্কায় ফিরে আসা পর্বত সদৃশ মসীবত হয়ে দাড়ালো। কয়েক বছর পূর্বে সেখান থেকে মুসলিম হিসেবে বের হয়ে এসেছে। এখন খৃষ্টান হয়ে ফিরে যাবে!! চরিত্র তো এর আগেই শেষ হয়ে গেছে। যাই হোক সে মনের মধ্যে এসব প্রশ্ন এবং তার পরিবারের নিকট পরিচিত উজ্জল চেহারার বদলে অন্ধকারাচ্ছন্ন চেহারা নিয়ে জেদ্দা বিমান বন্দরে অবতরণ করলো। পরিবারের লোকেরা তাকে এমন পোষাকে দেখলো, যা তারা কখনো দেখেনি। স্নেহময়ী মা তার দিকে অশ্র“ ভেজা চোখে এগিয়ে আসলো। ভাইবোনেরা তাকে আনন্দের সাথে স্বাদরে গ্রহণ করলেও শুকনো চোখে শুধু মার সাথেই আলিঙ্গন করলো। আসলে এখন সে এক জগতে এবং তার পরিবারের লোকেরা অন্যজগতে।
বাড়িতে ফিরে এসে বিষণ্ণ মনে সময় পার করতে লাগলো। তার এ অবস্থা পরিবারের লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। তারা লক্ষ্য করলো, দেশে ফিরে সে নামাযের জন্য পূর্বের অভ্যাস মত একবারও হারাম শরীফে যায়নি । তার মার কাছে ছেলের অবস্থা মোটেই গোপন রইলনা। তিনি একাকী তার রুমে নামায শেষে ছেলের জন্য অশ্র“ ভেজা নয়নে কেঁদে কেঁদে অবিরাম দুআ করে যাচ্ছেন এবং আল্লাহ তাআলার কাছে ছেলের হেদায়াতের জন্য কাকুতি-মিনতি করছেন।
একদিন তার ছোট বোন তার রুমে প্রবেশ করলো। সে তাকে খুব ভালো বাসতো। সে ছিল তার চেয়ে মাত্র কয়েক বছরের ছোট। তার বোন দেখলো, সে বিছানায় চিৎহয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। বিরক্তিকর আওয়াজে বিদেশী ভাষার গান শুনছে। ইতিমধ্যেই তার বুকে একটি স্বর্ণের চেইন পরিলক্ষিত হলো। চেইনটি নিয়ে খেলা করার সময় মেয়েটি চেইনের শেষ মাথায় খৃষ্টানদের ক্রুশ চিহ্ন দেখে চিৎকার করে উঠলো। সে ঘরের দরজা বন্ধ করে বোনকে শান্ত করার চেষ্টা করলো এবং প্রহার করার ভয় দেখালো।
.
একদিনের ঘটনা। তার মা তার ঘরে প্রবেশ করে বললেন, আমাকে গাড়িতে করে মসজিদে পৌছিয়ে দাও। সে কখনো তার মার আদেশ প্রত্যাখ্যান করতোনা। গাড়িতে উঠে বসে মাকে জিজ্ঞাসা করলো, কোথায় যেতে হবে? মা বললেন, হারাম শরীফে ইশার নামায পড়তে যাবো। হারাম শরীফে নামায পড়ার কথা শুনে নিয়ে যেতে অপারগতা প্রকাশ করার চেষ্টা করলো, কিন্তু গলায় কথা আটকে গেলো। অপছন্দ সত্ত্বেও হারাম শরীফের নিকটে গাড়ি থামিয়ে বললো, আপনি নামেন ও নামায পড়েন। আমি এখানেই অপেক্ষা করবো। তার মা অশ্রুসিক্ত নয়নে কোমল কণ্ঠে তাকে বললেন, হে আমার ছেলে! গাড়ি থেকে নেমে আমার সাথে মসজিদে চলো, আল্লাহকে স্মরণ করো। আমি আশা করি আল্লাহ তোমাকে হেদায়াত করবেন এবং তোমার দ্বীনে ফিরিয়ে আনবেন। হে আমার ছেলে! মাত্র কয়েক মিনিট লাগবে। চলো! নামায পড়ে একসাথে চলে আসি। কিন্তু মার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ নিষ্ফল হলো। সে তার অবস্থানে দৃঢ়তার সাথে অনঢ় রইল।
অবশেষে মা কাঁদতে কাঁদতে গাড়ি থেকে নেমে একাই মসজিদে চলে গেলেন। সে গাড়িতেই রয়ে গেলো। গাড়ির গ্লাস বন্ধ করে দিয়ে গানের ক্যাসেট চালু করে দিয়ে পিছনের দিকে হেলান দিয়ে তা শুনতে লাগলো। যুবকের বর্ণনায় বলছে, এরই মধ্যে মক্কার আকাশ ভেদ করে একটি মহান আওয়াজ আমার কানে বেজে উঠলো এবং মক্কার পাহাড়-পর্বত তাকে পুনরাবৃত্তি করতে লাগলো। এ তো মক্কার সুপ্রসিদ্ধ কারী শাইখ কারী মোল্লা আলীর কণ্ঠের আযানের সুমিষ্ট ধ্বনি, আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
যুবকটি বলছে, আযানের ধ্বনি আমার ভিতরে ভয় ঢুকিয়ে দিলো। আমি প্রায় অচেতন হওয়ার উপক্রম হলাম। সাথে সাথে গানের ক্যাসেট বন্ধ করে দিয়ে আযানের টানে মসজিদ পানে ছুটতে শুরু করলাম। এ তো সেই আযান, যা আমি বহু আগে শুনেছি। আল্লাহর কসম! মনের অজানতেই আমার চোখ থেকে পানি ঝরে গালের উপর বইতে লাগলো। হাত বাড়িয়ে গলা থেকে খৃষ্টান ধর্মের প্রতীক অপবিত্র ক্রুশ চিহ্ন ছিড়ে ফেললাম। মসজিদের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় আমার ক্রন্দনের আওয়াজ পথিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো।
দৌড়িয়ে ওযুখানায় গিয়ে কাপড়-চোপড় খুলে গোসল করে মসজিদ ও ইসলাম থেকে দূরে থেকে সাত বছর পর প্রথমবার মসজিদে প্রবেশ করলাম। পবিত্র কাবা ঘরের দিকে তাকিয়ে এবং মসজিদ ভর্তি আল্লাহর বান্দাদের হাজার হাজার বিনীত চেহারা দেখে হাটুর উপর পড়ে গেলাম। বহু কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে ইমামের সাথে নামায আদায় করলাম। পাশের লোকেরাও আমার ক্রন্দনের আওয়াজে বিরক্তি বোধ করলো। নামায শেষে একজন যুবক আমাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিলো এবং আমাকে শান্ত করতে লাগলো। সে আমাকে বুঝাতে গিয়ে বললো, আল্লাহ অবশ্যই সমস্ত গুনাহ ক্ষমা কনেন এবং তাওবাকারীর তাওবা কবুল করেন। আমি তার জন্য দুআ করলাম এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।
.
নামায শেষে আমি মসজিদ থেকে বের হলাম। গাড়ির কাছে আমার স্মেহময়ী মাকে জায়নামায হাতে নিয়ে অপেক্ষারত পেলাম। আমি তার পায়ে পড়ে চুমু খেতে লাগলাম এবং কাঁদতে লাগলাম। তিনিও কাঁদতে কাঁদতে আমার মাথায় কোমলভাবে হাত বুলাতে লাগলেন। তিনি আসমানের দিকে দুই হাত তুলে বলতে লাগলেন, অনুবাদ-
হে আমার প্রভু! তোমার জন্য সকল প্রশংসা, হে আমার রব! তোমার জন্য সমস্ত প্রশংসা। হে আমার প্রভু! তুমি আমার দুআ কবুল করেছো এবং আমার আশা পুরণ করেছো। আলহামদুলিল্লাহ,আলহামদুলিল্লাহ।
অতঃপর গাড়ির দরজা খুলে তার মাকে গাড়িতে উঠিয়ে বাড়ির পথে যাত্রা করলাম। ক্রন্দনের কারণে তার সাথে কোনো কথাই বলতে পারলামনা। তাকে বলতে শুনলাম, হে আমার ছেলে! আজ আমি মসজিদে এসেছি কেবল তোমার জন্য দুআ করতে। আমি কখনো তোমার মা হিসেবে তোমার জন্য দুআ করতে ভুলে যাইনি। আমি চেয়েছিলাম, আমি জীবিত থাকতেই যেন আল্লাহ তোমাকে হেদায়াতের পথে ফিরিয়ে আনেন এবং তোমার উপর রহম করেন। অতঃপর আমি সালাত আদায়, কুরআন তেলাওয়াত, যিকির-আযকার ও অন্যান্য কল্যাণকর কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। কিন্তু এবার আমি এক নতুন সমস্যার সম্মুখীণ হলাম।  ইতিমধ্যেই আল্লাহ তাআলা আমাকে ভালো একজন আলেম ও শাইখের সন্ধান দিলেন। তার সঙ্গ পেয়ে কয়েক পাড়া কুরআন মুখস্ত করে ফেললাম। অতঃপর আমি কুরআনের এই আয়াতগুলো পড়ে এবং তার অর্থ বুঝে পরিতৃপ্ত হলাম, আল্লাহ তাআলা বলেন,
অনুবাদ-
“হে নবী! বলে দাও, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়োনা৷ নিশ্চিয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন৷ তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু”। (সূরা যুমারঃ ৫৩)
আল্লাহ তাআলা বলে
অনুবাদ-
“আর দিনের দুই প্রান্তেই নামায কায়েম করো এবং রাতের প্রান্তভাগেও; সৎ কাজ অবশ্যই পাপকাজগুলোকে দুর করে দেয়, যারা স্মরণ রাখে তাদের জন্য এটি এক মহা স্মারক”। (সূরা হুদঃ ১১৪)
আল্লাহ্ তাআলা আরো বলেন,
অনুবাদ-
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য নির্ধারণকারী বিষয় দান করবেন এবং তোমাদের পাপগুলো তোমাদের থেকে দূরে করে দেবেন এবং তোমাদের ত্র“টি-বিচ্যুতি ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অতিশয় অনুগ্রহশীল”। (সূরা আনফালঃ২৯)

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
copyright 2020: ittehadtimes24.com
Theme Customized BY MD Maruf Zakir