1. admin@idealmediabd.com : Sultan Mahmud : Sultan Mahmud
মুক্তির গল্প - ইত্তেহাদ টাইমস
বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:২৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
মতবিরোধ পরিহার করে মুসলিমদের এক হওয়ার ডাক দিলেন এরদোগান ট্রাম্প সহিংসতা উসকে দিচ্ছেন, দায় তাকেই নিতে হবে: নির্বাচনী কর্মকর্তা দেশে করোনাভাইরাসে আরও ৩৮ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ২১৯৮ বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান এবার উন্মুক্ত স্থানে নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করোনায় দেশে গত ২৪ ঘন্টায় আরও ৩১ মৃত্যু, শনাক্ত ২২৯৩ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর রোগমুক্তি কামনায় গোয়াইনঘাট গ্রাম পুলিশের মিলাদ মাহফিল সাঈদুর রহমান লিটনের কবিতা “ফুলকি” দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তাখাসসুসের মাদরাসা প্রতিষ্ঠা জরুরি : আল্লামা আলিমুদ্দিন দুর্লভপুরী মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে কঠোর হচ্ছে সরকার নাইজেরিয়ায় নামাজের সময় মসজিদে সন্ত্রাসীদের হামলা; নিহত ৫

মুক্তির গল্প

রিপোর্টার নাম:
  • প্রকাশটাইম: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০

মনিরা মিতা //

ক্ষেতের আইলের সরু পথ ধরে আবু তালেব তার ব্রেক ছাড়া সাইকেলটা নিয়ে হেঁটে চলছে। তার সাইকেলটা দেখে একটা ভ্রাম্যমান দোকান মনে হচ্ছে। সাইকেলের কোথাও একটুও জায়গা খালি নেই। সাইকেলের সামনে তিনটে মুরগি দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে বাঁধা। অন্য পাশে ছোট একটা বাক্সে দুই জোড়া কবুতর। সাইকেলের ডানপাশে কতগুলো গোবরের লাঠি আর পাটকাঠি বাঁধা। বাম পাশে পুরানো কয়েকটা কাঁথা- বালিশ। পেছনে চাল, আটা, তেল, চিনির পুটলাগুলো থরে থরে সাজানো। এতো কিছু বেঁধে সাইকেল এতো ভারী হয়েছে যে এটা ঠেলে নিতেই কষ্ট হচ্ছে আবু তালেবের। গতকাল সকাল থেকে হাঁটা শুরু হয়েছে। রাতে অবশ্য একটা পরিত্যাক্ত বাড়ির বৈঠকখানায় কাপড় টাঙ্গিয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু এমন দুঃসময়ে ঘুম কি আসে!
হাঁটতে হাঁটতে বড্ড ক্লান্ত আবু তালেব। তাগড়া জোয়ান আবু তালেবকে তাই জরা-জীর্ণ  মনে হচ্ছে। তাকে এখন দেখে কে বলবে সে একজন পুলিশের সিপাহী?
-আব্বা তাড়াতাড়ি চলেন। ওই শোনেন বিমানের শব্দ শোনা যাচ্ছে। যে কোন সময় এদিকে চলে আসেব।
-হ, তাড়াতাড়ি হাঁটো সবাই। আর মাইল পাঁচ হাঁটলেই আস্তাকাঠি গ্রাম। সন্ধ্যার আগেই ওখানে পৌঁছাতে হবে।
-এই লেদা পোলা কোলে নিয়ে আর কত জোরে হাঁটা যায়? দুই দিন ধরে হাঁটতে হাঁটতে পা দুটো ফুলে গেছে
– খালি বেশি কথা কস।কথা থামায় তাড়াতাড়ি পা চালা নাইলে সবাই খানসামাদের হাতে ধরা পরবো।
আবু তালেবের তাড়া খেয়ে সবাই দ্রুত পা চালাতে শুরু করলো। ও হ্যাঁ, আবু তালেবের সাথে কিন্তু বিশাল এক বাহিনী আছে।
তার দুই স্ত্রী, তাদের দুজনের কোলে দুই  শিশু। বড় বউয়ের কোলের ছেলের বয়স ২১ দিন। আর ছোট বউয়ের ছেলের বয়স ৯ দিন। আরও সাথে আছে বড় বউয়ের দুই ছেলে মজিবর ও আজিজার। মজিবরের বয়স ১৩ বছর সে বরিশাল পুলিশ লাইন স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। দেখতে বেশ জোয়ান। আবু তালিবের সাথে চেহারায় এতো মিল যে কাউকে বলতে হয় না সে আবু তালেবের ছেলে। চেহারা দেখেই সবাই বুঝতে পারে। মজিবর তার মায়ের ভক্ত। মায়ের অনেক কাজ সে নিজেই করে দেয়। মজিবরের ৮ বছরের ছোট আজিজার। লম্বা- চওড়া, ফর্সা গড়নের আজিজার এখানো স্কুলে যায় না।
  -আব্বা আর কতদূর? পা বিষ করে, আর হাঁটতে পারছি না।’
-হারামজাদা না হাঁটলে এখানেই থাক। পাকিস্তানি জানোয়ারগুলো তোরে ধরে নিয়ে যাক।
বাপের বকুনি খেয়ে চুপসে যায় আজিজার। ছেলেকে বকা দিয়ে নিজেই গজগজ করতে করতে হাঁটতে থাকে আবু তালেব।
– বালাই ষাট,,,,কি কন এই সব।আমার পোলারে জানোয়ারগুলা ধরবে ক্যান! শত্রুর পোলারেও যেন না ধরে।ওই কুত্তাগুলার হাতে ধরা পরা মনেই মরণ।
-চুপ কর হারামজাদি। ছেলের ছাপাই গাওন লাগবো না।
বউকে বকতে বকতে অন্য মনস্ক হয়ে যায় সে।হঠাৎ সরু আইলের কাদায় পা পিছলে স্লিপ করে আবু তালেব। সাইকেল নিয়ে হুড়মুড় করে পরে যায় ধানক্ষেতের কাদা পানির ভেতর। কাদা পানিতে চুবনি খেয়ে একাকার আবু তালেব। ওদিকে সাইকেলে বাঁধা চাল, আটা, চিনি, কাঁথা- বালিস সব ভিজে গেছে। এই অভারের বাজারে এটুকু খাবারই তাদের এতোগুলো মুখের আহার। পুলিশের চাকরীর সুবাধে এগুলো সে রেশন পেয়েছে। যুদ্ধের এই বাজারে এগুলো মহামূল্যবান।
কাদা-পানিতে পরে আবু তালেব উঠতে পারছে না। তার ছোটবিবি ছেলে কোলে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে।আঁচলে মুখ টিপে হাসি লুকাচ্ছে। ওদিকে বড় বউ তাড়াতাড়ি কোলের ছেলেকে মেঝ ছেলের কোলে দিয়ে স্বামীকে ধরে। মজিবর আর তা মা নূরজাহান বেগম মিলে বহু কষ্টে আবু তালেবকে টেনে তোলে। কাদা পানিতে চুবনি খেয়ে আবু তালেবকে ভোঁজা মোরগের মতো দেখায়। সে রাগে-দুঃখে একা একাই পাকবাহিনীকে গালাগাল দেয়।
ভয়ে সবাই চুপ করে থাকে। ওদিকে আকাশে মেঘ জমেছে। যে কোন সময় বৃষ্টি আসবে। বৃষ্টি এলে ফাঁকা এই বিলে সবাই ভিজে মরবে। রাজ্যের চিন্তায় মাথা আসে আবু তালেবের। হঠাৎ একটা ঝপাং শব্দে পিছনে তাকায় সে। কি হল বেপারটা বুঝতে চেষ্টা করে। এমন সময় তার বড় বিবি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। স্বামীকে কাদা-পানি থেকে তুলতে গিয়ে সে আর তার বড় ছেলে একেবারে ভিজে গেছে। তাই ছোট ছেলেকে মেঝে ছেলের কোলে দিয়ে ছিলো। আজিজ পা পিছলে পরে গেছে। কোলের ছেলে হাফিজার কাদা পানিতে পরে গেছে। ২১ দিনের বাচ্চা কাদা পানিতে পরে গেলে কি হয় ভাবা যায়?
মজিবর আর তার মা ধানক্ষেতে মাছ ধরার মতো হাতড়ে খুঁজতে থাকে ছোট হাফিজারকে। আবু তালেব বউকে গালাগাল দিয়েই যাচ্ছে। তার ছেলের কিছু হলে কপালে দুঃখ আসে এই হুমকি দিয়ে যাচ্ছে বউকে। যদিও সে নিজে তার ছেলেদের ব্যাপারে উদাসিন তবুও ছেলের বাপ সে। তার উপর তার ছেলের কপাল। একে একে চার ছেলের বাপ সে। বউকে গালাগাল দিয়ে সে বাপের দায়িত্ব পালন করছে।
মিনিট তিনেক কাদা পানিতে খোঁজাখুঁজি করার পর অবশেষে পাওয়া গেল হাফিজারকে। নাকে মুখে কাদা-পানি লেগে আছে,ওর চোখ বন্ধ। মজিবর বুকে কান পেতে শোনে নাকে হাত দিযে দেখে নিশ্বাস চলছে কি না। নাহ্, নিশ্বাস চলছে না। মজিবরের মা ছেলের শোকে বিলাপ করতে থাকে। আবু তালেব ছোঁ মেরে হাফিজারকে নেয়। মাথা নিচে দিয়ে দুই পা উপরের দিকে তুলে ঝাঁকি দেয় ছেলেকে। নাকে-মুখে ফুঁ দেয়। একসময় কেঁদে ওঠে ছোট হাফিজার। ওর কান্নায় সবার শুক্ন মুখে হাসি ফুঁটে উঠে। মজিবর, আজিজার আর হাফিজার তিন ছেলেকে আকড়ে ধরে সাবধানে পথ চলে আবু তালেবের বড় বিবি। ছোট বিবি সালেহা ছেলে কোলে স্বামীর পিছু পিছু তার পাঞ্জাবীর কোণা ধরে হাঁটতে থাকে। পড়ন্ত বিকেলে তারা এসে পৌঁছায় আস্তাকাঠি গ্রামের দূর সম্পর্কের আত্মীয়র বাড়ি।
অসময়ে এতো অতিথি দেখে মোটেও খুশি হয় না বাড়ির মালিক। কিন্তু তাদের সাথে চাল-আটা দেখে মুহুর্তেই মুখে হাসি ফোঁটে তার। কাচারি ঘরে থাকতে দেয় আবু তালেবের পরিবারকে। এই অঁজ পারা গাঁ এখনো পাকহানাদারদের নজর থেকে মুক্ত। সুতরাং এখানে থাকা কিছুটা নিরাপদ।
সকালের সোনা রোদ উঠান জুরে ঝলমল করছে। আজিজার বাড়ির অন্য ছেলেমেয়েদের সাথে রান্না-বাটি খেলছে। ছোট বিবি দাওয়ায় বসে পান চিবুচ্ছে। আবু তালেব তার বড় বিবি আর বড় ছেলেকে সাথে নিয়ে ভেজা চাল-আটা- চিনি রোদে শুকাচ্ছে। এতো চাল-আটা দেখে বাড়ির মালিকের চোখ চকচক করছে। এরা ভাত রান্না করলে নিশ্চই তাদেরও এক প্লেট দেবে, এই ভেবে এক্ষুণি তার জিভে জল এসে যাচ্ছে।
আহ্ ভাত! কত দিন ভাতের মুখ দেখেনা বৃদ্ধ রমিজ উদ্দিন। জোয়ান পোলাডা তার যুদ্ধে গেছে। মুক্তিযুদ্ধে। ঘাড়ের উপর ফেলে গেছে তার বৌ-বাচ্চা। তার উপর রমিজ উদ্দিনের নিজের ডাগর দুই মেয়ে আছে আর আছে তার অসুস্হ বউ । বৌ তার সারিদিন পোলার জন্য কান্নাকাটি করে। রমিজ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে -কান্দো না মাতারি। মোগো পোলায় যুদ্ধে গেছে। হ্যারে তুমি আল্লার নামে দ্যাশের লাইগা কুরবানি দিয়া দাও।
আবু তালিবের দুই বিবি রুটি বানাচ্ছে। তাজা রুটির ঘ্রাণ সবার নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আবু তালিব ছেলেদের নিয়ে খেতে বসেছে। কিন্তু সে খেতে পারছে না। ও ঘরের ক্ষুদার্থ মুখগুলো তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।
অবশেষে রমিজ উদ্দিনকে ডাক দেয় সে।
-মেয়া ভাই এদিক আসেন। একখান রুটি খান।
রমিজ উদ্দিন তার নাতির হাত ধরে হাসি মুখে এসে বসে।
দেখতে দেখতে চাল-আটা প্রায় শেষের পথে। চিন্তায় আবু তালিবের মাথা ভনভন করে ঘুরতে থাকে। এতোগুলো মুখের খাবার কই পাবে সে। এমন সময় তার মাথায় আসে রেশনের কথা। নতুন মাস শুরু হইছে। পুলিশ লাইন গেলেই রেশন আনতে পারবে সে। কিন্তু রাস্তায় পদে পদে বিপদ অপেক্ষা করছে। । জোয়ান আবু তালেবকে হাতে পেলেই পাক হানাদার মেরে ফেলবে। তাগড়া জোয়ানরাই তো মুক্তিযুদ্ধ করছে তাই এদের ভয় পায় পাকসেনারা। সব বিপদ উপক্ষো করে তবুও আবু তালেবকে যেতে হবে রেশন আনতে। তা না হলে তার পুরো পরিবার না খেয়ে থাকবে।
স্বামী এতো পথ পাড়ি দিয়ে রেশন আনতে যাবে শুনে বড় বিবি বাঁধা দেয়।
-আপনার ওতো দূর যায়ে কাম নাই। রাস্তায় যদি কোন বিপদ হয়। তার চেয়ে এখানেই কিছু ব্যবস্থা হয় কিনা দেখেন।
এটা শুনে ছোট বিবি মুখ বাঁকা করে বলে
-উুঁ, সোহাগ দেখে আর বাঁচিনে। রেশন না আনলে কি না খেয়ে থাকপো! আমি খিদে সহ্য করতে পারি না। আল্লাহর নামে রাস্তায় নেমে পরেন। দেখবেন কিচ্ছু হবে না।
আবু তালেব ভাবনায় পরে যায়। কি করবে সে? অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয় কপালে যা আছে হবে তবুও রেশন আনতে যাবে। তাছাড়া পুলিশ লাইনে গেলে বেতন ভাতার কিছু টাকাও পাবে। সুতরাং তাকে যেতেই হবে।
এক সকালে গোসল করে তাবু তালেব নিজেকে পরিপাটি করে নেয়। চোখে সুরমা লাগায়। স্বামীর এই সাজগোজে দুই বউ ভয় পেয়ে যায়। এতো সেজেগুজে কি আবার বিয়ে করতে যাচ্ছে সে!
ছোট বউ খেকিয়ে উঠে বলে -সাত সকালে মিনশের এতো সাজ ক্যান শুনি? আবার বিয়ের খায়েশ হয়ছে নাকি?’
-চুপ কর মাগী। আমি বানিচে আমার জ্বালায়। তুগার মনে এতো রঙ আসে ক্যামনে? বিয়া যদি করতিই হয় দ্যাশ স্বাধীন হলে করবো। ছোট বিবি মুখ ঝামটা দিয়ে চলে যায়। আবু তালিব ট্রাঙ্ক খুলে জিন্নাহ টুপি অার পাকিস্তানের পতাকা বের করে। মজিবর চোখ বড় বড় করে বাবার দিকে চেয়ে থাকে। তার বাবা পাকিস্তানি পাতাকা হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখে। হঠাৎ পতাকার উপর একগাল থু থু মারে। তারপর নোংরা কাপড় দিয়ে থু থু মোছে। আবার থু থু ছিটায়। এভাবে বার কয়েক থু থু ছিটিয়ে পরিস্কার করে। তারপর সেই পতাকা আঠা দিয়ে জামার উপর বুক বরাবর লাগায়।
এরপর সে জিন্নাহ টুপি হাতে নেয়। টুপিটা সে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পারায়। তারপর টুপিটা তুলে ময়লা ঝেড়ে পরিস্কার করে। আবার মাটিতে ফেরে পারায়। এভাবে চলতে থাকে অনেক্ষণ। এক সময় ক্লান্ত হয়ে টুপিটা পরিস্কার করে মাথায় দেয়। মজিবর ওর বাবার চোখে তাকিয়ে আছে, তার দুটোয় ঘৃনা উতলে পরছে।এক সময় আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে সাধের সাইকের নিয়ে রাস্তায় নামে তার বাবা।
মজিবর তার প্রিয় লাল রেডিওটা নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে। রেডিওতে দেশের খবর শোনে। যুদ্ধের খবর শুনে তার কিশোর মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। পাকহানাদারদের মৃত্যুর সংবাদে তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলে -জয় বাংলা…. তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ।
বিচ্ছু বাহিনীর কথা শুনে তার মনের ভেতরও সাধ জাগে বিচ্ছু বাহিনীতে যোগ দিতে।
ছেলের এমন আচারনে চিন্তিত হয়ে পরে তার মা। ছেলের হাতে রেডিও দেখলেই সে ক্ষেপে ওঠে।
-ওই মজিবর, সারাদিন ট্যানডেস্টার নিয়ে কি করিস তুই? এসব সারাদিন নিয়ে ঘুরবি না। আর জয় বাংলা বলা লাগে কি জন্যি!এসব বললে কলাম তোর ওই লাল বাক্স আমি ভাঙ্গে ফেলবো।
-এসব কি কচ্ছো মা। রেডিওতে দেশের কথা কয়, যুদ্ধের কথা কয়। দেইখো একদিন আমরা স্বাধীন হবে।
-ও মজিবরের মা তুমার বড় পোলার নাম বদলায় থোও।
-ক্যান বুজান? নাম বদলানো লাগবো ক্যা?
-আরে এক শেষ মুজিবরের যন্ত্রনায় পাকবাহিনী অস্থির। এখন যদি তুমার পোলার নাম মজিবর শোনে হ্যাইলে কি হ্যারা তোমার পোলারে আস্ত রাখবো? মোর মনে কয় তোমাগো উচিত মজিবররে আলেদা নামে বুলানো।
-হ, ঠিকই কইছেন বুজান। তাইলে আজ থেইকা ওর না ‘বাঁশি’। দ্যাশ স্বাধীন হবার আগে ওরে মজিবর বলে কেউ ডাকপো না।
মজিবর সারাদিন বন বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। তার মনের ভেতর মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেয়। সে শুনছেন বনে জঙ্গলে মুক্তিবাহিনী ঘাঁটি গাড়ে। তাই সে জঙ্গলে ঘোরে যদি কোন মুক্তিযোদ্ধার দেখা পায়!
রেডিওতে সে শুনচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বিচ্ছু বাহিনী নামে দল আছে। সেখানে ছোটরা কাজ করে। পাকবাহিনীর খবর এনে দেয়। এলাকায় নজর রাখে। রাজাকারদের গতিবিধি ক্যাম্পে জানায়। মজিবর চায় মুক্তিযুদ্ধে যেতে,অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করতে পারলেও বিচ্ছু বাহিনীতে ঠিক কাজ করতে পারবে সে। রমিজ চাচার মুক্তিযোদ্ধা ছেলে যদি বাড়ি আসতো তাহলে  কত ভালোই না হতো!
বড় ছেলের মতিগতি ঠিক ভালো লাগছে না নূরজাহান বেগমের। ছেলে তার কেবল উসখুস করে, রেডিও তে যুদ্ধের খবর শোনে। মজিবর তার বড় আদরের ধন। সে চায় না তার ছেলেকে হারাতে। ছেলের যুদ্ধে যাবার কথা মনে হলেই তার ভীতু বুকটা ধুকধুক করে।
এক সন্ধ্যায় সে ছেলের কাছে বসে তার মাথায় হাত বুলায়।
-কি হইছে বাজান তোর। এমন ঝিম ধরে থাকোস ক্যান!
-মা আমি যুদ্ধে যেতে চাই। তুমি আমারে যাওয়ার অনুমিত দাও।
-কি কস তুই বাজান! তুই একথা মোটেও মুখি আনবি না। তুই আমার কলজে। তুই না থাকলি আমি মরেই যাবো।
-না, মা তুমি আমারে বাঁধা দিও না। সবাই যুদ্ধে গেছে। দেখ রমিজ চাচার ছাওয়ালও যুদ্ধে গেছে। আমিও যাইতে চাই।
-তুই যদি যুদ্ধে যাস তালিপরে আমার মাথা খাস।
-এইডা তুমি কি করলে মা?
মায়ের মাথা খাওয়ার দিব্যি মজিবরের মনকে কোণঠাসা করে রাখলো। তবুও বুকটাতে তার কষ্ট দলা পাকিয়ে ওঠে। দেশের জন্য মন কাঁদে।
ওদিকে আবু তালিব বহু কষ্টে পুলিশ লাইন পোঁছায়। রেশন আর বেতন ভাতা নিয়ে আবার আস্তা কাঠির পথে পা বাড়ায়।
নিজের বাড়ি ফরিদপুর জেলায় হলেও আস্তাকাঠি তার দূর সম্পর্কের ভাই রমিজের বাড়ি। এই বাড়িটি  রমিজের বৌ তার বাপের কাছ থেকে উত্তাধিকার সূত্রে পেয়েছে। দুর্দিনে দূরের সম্পর্কটাও আপন হয়ে ওঠে। ফেরার পথে রাস্তায় কয়েকবার পাক হানাদারের হাতে আটক হয় আবু তালেব। কিন্তু মাথায় জিন্নাহ টুপি, বুকে পাকিস্তানি পতাকা আর মুখে উর্দু ভাষা তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে বারবার। তবে এই বাঁচা তার মনকে মেরে ফেলেছে বহুবার।
পাকবাহিনীর সামনে হুজুর হুজুর করলেও দূরে এসে গাল ভরে গালি দেয় ওদের। ঘৃনায় মুখ বাঁকা করে থুথু ফেলে।
আল্লাহ, আল্লাহ বলে জিকির করতে করতে অবশেষে সন্তানদের কাছে ফিরে আসে আবু তালেব। বাড়ি এসে পাকবাহিনীর অত্যাচারের ঘটনার বর্ণনা করে সে।পথিমধ্যে অনেক বর্বর ঘটনা দেখেছে সে।ওরা সবার ঘর- বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে।হাজার হাজার মানুষ বিনা দোষে মেরে ফেলছে।
মজিবর সব শুনে জেদে ফুসতে থাকে। ওর মন চায় পাকিস্তানি শয়তানগুলোকে খতম করতে।সুযোগের অপেক্ষায় থাকে সে।
সকাল থেকে পুরো আস্তাকাঠি গ্রাম থমথমে। নদীর ওপারেই ঘাঁটি গেড়েছে পাকহানাদার বাহিনী। যেকোন সময় তারা হামলা করবে। ভয়ে সবার চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। ঘনঘন হেলিকপ্টার টহল দিচ্ছে। আবু তালেব বুঝতে পারে সামনে ঘোর বিপদ। তাই সে বৌদের সাথে নিয়ে বাঙ্কার খনন করে। মস্ত বড় বাঙ্কার। বিপদ দেখলে সে তার পুরো পরিবার নিয়ে সেখানে লুকিয়ে থাকবে। তার মত সবাই এমন বাঙ্কার খোঁচে। জীবন মানুষের সবচেয়ে প্রিয়। কেউ তা হারাতে চায় না।
মজিবর কিন্তু বাড়িতে থাকে না। সুযোগ পেলেই সে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। তার চোখ দুটো শুধু মুক্তিযোদ্ধোর খোঁজ করে। মনে ভেতর দেশের জন্য টান অনুভব করে।
কয়েকদিন থেকে রোদের খুব তেজ বেড়েছে। চারিদিক খাঁ-খাঁ করছে। গরমে আম-কাঁঠাল পেকেছে। আম-কাঠালের গন্ধে চারিদিক মৌ মৌ করছে।
রমিজ উদ্দিনের ৭ বছরের নাতি বাঁশের কুঞ্চি দিয়ে বন্ধুক বানিয়ে ঠা ঠা শব্দ করে গুলি করে। খেলতে খেলতে সে আবু তালিবের কাছে আসে এসে বলে -কমমে যাও মনু? মোর লাগে ক্যাম্পে চলো তোমার বিচার হইবে। মুই মুক্তিযুদ্ধা।
আবু তালেব হেসে বলে আমি তো সাধারন মানুষ। আমি কোন দোষ করিনি মুক্তিভাই।
-দাদা আননে ক্যান যুদ্ধে যান না?
আবু তালিব দুষ্টমী করে বলে -আমার ছোট বিবি দেখতে সৌন্দর। তারে রাইখা ক্যামনে যুদ্ধে যাই মুক্তিভাই? আগে আপনে বিয়া করেন আপনিও বুঝবেন বিবি কি জিনিস। বিয়ের একথা শুনে লজ্জা পেয়ে পালিয়ে যায় পুচ্চকিটা।
মজিবর দূরে ঘরের দাওয়ায় বসে সব দেখছিলো। যদিও জানে কথাটা তার বাবা ইয়ার্কি করে বলেছে তবুও ব্যপারটা ওর মনে খুব আঘাত করলো। মজিবর ভেতরে ভেতরে বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। সে দ্রুত পা চালিয়ে বাড়ির বাইরে চলে গেল।
এমন সময় শাঁ শাঁ শব্দে বিমান ছুটে এলো। একটা, দুইটা, তিনটা,,,,, তারপর ঝাঁকে ঝাঁকে বিমান আসতে লাগলো।
সবাই দ্রুত বাঙ্কারে ঢুকলো। আবু তালেব তার ছোট বউয়ের হাত ধরে গর্তে ঢুকলো। ওদিকে বড় বউ মেঝে ছেলের কাছে ছোট ছেলেকে দিয়ে বের হয়ে এলে। পিছন থেকে আবু তালেব হাঁক দিল -কই যাস, বাইরে যাসনে মারা পরবি।
-আমার বড় পোলা বাইরে। তারে খুঁজতে যাই।
ছোট বিবি মুখ বাঁকিয়ে বলে -পোলার জন্যি জীবন দেবে নাকি মাতারী! নিজে বাচলে বাপের নাম।
-বাঁশি, ও বাঁশি কই গেলি বাজান। তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়। উপর থেকে বোমা ফেলবো পাকসেনারা। বাড়ি আয় বাজান।
বহু খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে ছেলেকে খুঁজে পেল সে। তারপর ছেলের হাত ধরে বাঙ্কারে ঢুকলো। তারপর গর্তের উপর দিয়ে দিল তালপাতা। উপর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে ভেতরে এতো মানুষ কুন্ডুলি পাঁকিয়ে লুকিয়ে আছে।
রাতের নিস্তব্ধতায় চারিদিক থমকে আছে। একটা কুকুর থেকে থেকে কেঁদে উঠছে। সবাই ঘুমিয়ে আছে। শুধু মজিবরের চোখে ঘুম নেই। তার বিক্ষিপ্ত মনে ভেসে ওঠে বেলাল ভাইয়ের ছবি। আজ দুপুরে বেলাল ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছে তার। আজ রাতে সে সহ আরো দু’জন যুদ্ধে যাবে। মজিবর তাদেরকে খালপাড়ে তার জন্য অপেক্ষা করতে বলেছে। মজিবর যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত শুধু মায়ের মুখটা তাকে পিছু ডাকছে। এমন সময় পাকবাহিনীর অত্যাচারের কথা তার মনে পরে। কত নিরীহ মানুষ মারছে তারা। দেশটাকে তছনছ করে দিচ্ছে। মুহুর্তেই মজিবরের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে বলে -জয় বাংলা। তারপর ঘর ছেড়ে বাইরে বের হয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ছেলেকে নামাজের জন্য ডাকতে যায় মজিবরের মা। কিন্তু ছেলে তার বিছানায় নেই। হঠাৎ তার বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে। বালিশ সরাতেই হাতে পায় মুজিবরের চিঠি। ডুকরে কেঁদে ওঠে সে। তার কান্নার শব্দে আবু তালেব সহ বাকী সবাই তড়িঘড়ি ছুটে আসে।
মজিবর যুদ্ধে গেছে জেনে রমিউ উদ্দিন বলে ওঠে-সাবাস বেটা।তুই মোগো গর্ব।
আবু তালেব ছেলের চিঠিটা হাতে নিয়ে ধপাস করে মাটিতে বসে পরে। তার এক রত্তি ছেলে দেশের জন্য যুদ্ধে গেছে অথচ তার মতো জোয়ান মানুষ ঘরে বসে আছে! বিবেক তাকে তাড়া করে ফেরে। মুহুর্তেই আবু তালিবের মনে দেশের জন্য প্রচন্ড মায়া হয়। সে বীরের মতো উঠে দাঁড়ায়। সে একজন সৈনিক। এদেশ তার ও দেশ। সে ভীরু কাপুরুষ নয়। ভোরের আলো ফুটার আগেই আবু তালিব বেরিয়ে পরে ঘর ছেড়ে। ছেলের দেখানো পথে সেও হেঁটে চলে। পিছনে ফেলে যায় তার পুরো পরিবার।

লেখিকা:- শিরোমনি, খুলনা।

এটি//

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
copyright 2020: ittehadtimes24.com
Theme Customized BY MD Maruf Zakir