1. admin@idealmediabd.com : Sultan Mahmud : Sultan Mahmud
'লিভিং ঈগল'র মৃত্যু ও জাতির নীরবতা : রাসেল মাহফুজ - ইত্তেহাদ টাইমস
শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১, ১২:৪৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম:

‘লিভিং ঈগল’র মৃত্যু ও জাতির নীরবতা : রাসেল মাহফুজ

রাসেল মাহফুজ
  • প্রকাশটাইম: মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২০

 

রাসেল মাহফুজ

জি, সত্যিই ‘লিভিং ঈগল’র মৃত্যু ও জাতির নীরবতা আমাকে ভাবাচ্ছে, বেশ ভাবাচ্ছে। আপনারা যাদের মৃত্যুতে বেহুদা ট্রল করছেন বা যাদের মৃত্যুতে স্ট্যাটাসের পর স্ট্যাটাস প্রসব করছেন গভীর শোকে কাতর হয়ে, তাদের থেকে আমার কাছে এই ঈগলের দাম ও মান অনেক বেশি। সুতরাং আপনাদের এই শোকবার্তার পর শোকবার্তা দেখে আমার দুঃখবোধ হচ্ছে।

আমাদের গর্ব ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজমের কথা বলছি। তাকে চেনেন আপনারা? মনে হয় না। চিনলে অবশ্যই তার মত্যুতে অন্তত ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া-ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়তেন। কিন্তু…

আমাদের প্রজন্ম মহান এই ব্যক্তিকে পুরোপুরি না চেনার কথা। তবে আমাদের পূর্বপ্রজন্মও যে নীরবতা পালন করছেন, এর দায় এড়াতে পারবেন না কিন্তু। জাতির মহাবীরদের নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া আপনাদের দায়িত্বও বটে। আমরা চিনি না তাকে, এটা আমাদের ব্যর্থতা নয়, আপনাদের অবহেলা।

কে এই সাইফুল আজম?

শুরুতেই বলেছি, আমাদের গর্ব ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তিনি। ‘এয়ারস্পেস ডগ ফাইট’ বা ‘শূন্যের বুকে সম্মুখসমর’-এ অজেয় বলে খ্যাত ইসরাইল ও ভারতের জঙ্গি বিমান ধ্বংসকারী তিনি। তিনি ছিলেন বিশ্বের ইতিহাসে একমাত্র ফাইটার পাইলট যিনি বাংলাদেশ, পাকিস্তান, জর্ডান, ইরাক এই চারটি মুসলিম দেশের বিমান বাহিনীর ফাইটার হিসেবে কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তিও তিনি, যিনি তিনটি ভিন্ন দেশ থেকে পেয়েছেন যুদ্ধজয়ের মহান স্বীকৃতি স্বরূপ সামরিক সম্মাননা।

তৎকালীন ভারতের ‘ফোল্যান্ড নেট’ বিমান আর ইসরাইলের ‘সুপার মিস্টেরে’ সহ কয়েকটি জঙ্গি বিমানকে পর্যুদস্ত করা খুব সহজ ব্যাপার নয়। তাও আবার জর্ডানের ‘হকার হান্টার’ আর পাকিস্তানের ‘এফ-৮৬ স্যাবরজেট’ এর মতো তুলনামূলক অত্যন্ত দুর্বল বিমান নিয়ে। তা সম্ভব হয়েছিল একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছায় ও সাইফুল আজমের অসাধারণ দুর্ধর্ষতায়। তার ঈগল পাখির নিশানার চোখের সুতীক্ষ্ণতার সামনে উন্নত উন্নত জঙ্গি বিমানগুলো ছিল অসহায়।

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও তিনি চেয়েছিলেন সশরীরে অংশগ্রহণ করতে। কিন্তু পারেননি। কারণ, পাকিস্তান জানত, অকুতোভয় এই মহাবীর যদি বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে যান তাহলে কী সর্বনাশ হবে। সেজন্য তাকে সাময়িক সময়ের জন্য ‘গ্রাউন্ডেড’ (তথা একজন পাইলটকে সাময়িকভাবে উড্ডয়নে নিষেধাজ্ঞা) জারি করে আটকে রাখে পাকিস্তান বিমানবাহিনী।

সাইফুল আজম দেশের পক্ষে লড়াই করার লক্ষ্যে তার পরিবারকে যুদ্ধ শুরুর আগে ৬ মার্চ ঢাকায় পাঠিয়েও ছিলেন। এরপর পাকিস্তান এয়ারলাইন্স ও বিমানবাহিনীতে থাকা বাঙালি সহকর্মীদের নিয়ে তিনি পরামর্শও করেছিলেন করাচি থেকে পাকিস্তানের জেট বিমান ছিনতাই করে বাংলাদেশে নিয়ে আসার। এই পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। তাই এই অপারেশন সাকসেস হয়নি।

এদিকে সাইফুল আজমের সরাসরি সমরবিদ্যার শিষ্য বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানও পরিকল্পনা করেছিলেন বিমান ছিনতাইয়ের। গোপন আলোচনার ভিত্তিতে পাকিস্তানের ‘টি-৩৩’ জঙ্গি বিমান নিয়ে বাংলাদেশের দিকে উড্ডয়নের সময় মতিউর রহমান ধরা খেয়ে যান। শাহাদতবরণ করেন পাকিস্তানি বাহিনীর আঘাতে।

এই ঘটনার পর পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা সাইফুল আজমকে আটক করে রিমান্ডে নেয় এবং টানা ২১ দিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একপর্যায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু জর্ডানের বাদশাহ হুসেইন ও পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল এ রহিম খান বাঁধা হয়ে দাঁড়ান। বলা হয়, তাদের অনুরোধে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। তার অপরাধ ছিল, মতিউর রহমানের পরিকল্পনা ও ছিনতাই অপারেশনে তার হাত ছিল। এটা সত্যও বটে।

দেশ স্বাধীনের পর ফিরে আসেন সাইফুল আজম। ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশের উইং কমান্ডার পদে উন্নীত হন। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ঢাকা ঘাঁটির অধিনায়কত্ব প্রদান করা হয় তাকে। বিমান বাহিনীর ডিরেক্টর অব ফ্লাইট সেফটি ও ডিরেক্টর অব অপারেশনস এর দায়িত্বও পালন করেন তিনি সুচারুভাবে। অবশেষে ১৯৭৯ সালে তিনি গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

আকাশযুদ্ধে অনন্য সব অর্জন আর বীরত্বের ইতিহাস গড়া ওয়ার্ল্ড ফাইটার সাইফুল আজমকে ২০০১ সালে ‘ইউনাইটেড স্টেটস এয়ার ফোর্স’ বিশ্বের ২২ জন ‘লিভিং ঈগলস’ এর অন্যতম একজন ঘোষণা করে। সত্যিই আমাদের এই ‘লিভিং ঈগল’ ছিলেন সুতীক্ষ্ণ চোখের অধিকারী। ঈগল পাখির মতো ছিল তার অব্যর্থ নিশানা। যেই নিশানার কাছে অসহায় ছিল শক্তিশালী সব যুদ্ধবিমান।

আশির দশকের দিকে দু’বার সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৯১-৯৬ সালে পাবনা-৩ আসন থেকে বাংলাদেশের পার্লামেন্টারিয়ানও নির্বাচিত হন এই সাইফুল আজম। অতঃপর নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘নাতাশা ট্রেডিং এজেন্সি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বগ্রহণ করেন।

ইতিহাসের একটি চেপে রাখা অধ্যায়ের মহান নায়ক সাইফুল আজমের জন্ম ১৯৪১ সালে, পাবনা জেলার খগড়বাড়িয়াতে। সদ্য (১৪ জুন-২০২০) তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। আল্লাহ তাকে তার আমল অনুযায়ী মাকাম দান করুন। জান্নাত নসিব করুন।

তার মত্যুতে দেশের কর্তাব্যক্তিরা নীরব! বিশেষ অজ্ঞের দলটির মুখেও কুলুপ আঁটা। এমনকি আমারও। দুঃখজনক…

লেখক: প্রধান পরিচলক, বাতায়ন ও বিভাগীয় সম্পাদক, সিলেটের দৈনিক শুভ প্রতিদিন

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
copyright 2020: ittehadtimes24.com
Theme Customized BY MD Maruf Zakir