1. admin@idealmediabd.com : Sultan Mahmud : Sultan Mahmud
শরিফ আহমাদের গল্প 'বাবার দোয়া' - ইত্তেহাদ টাইমস
শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১, ১১:২০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:

শরিফ আহমাদের গল্প ‘বাবার দোয়া’

মাওলানা শরিফ আহমাদ
  • প্রকাশটাইম: মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

সাজিদ সাফিন ৷ বগুড়ার মানুষ ৷ ইদানীং ঢাকায় থাকেন ৷ লেখাপড়া করেন ৷ পাশাপাশি একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি করেন ৷ মোটামুটি ভালোই দিন যাচ্ছে ৷ শহুরে জীবনে বন্ধু-বান্ধবের অভাব নেই ৷ অবসরে আড্ডাও জমে দারুণ ৷ এই তো বৃহস্পতিবার রাতের কথা ৷ আড্ডা শেষে বাসায় ফিরছেন তিনি ৷ গোটা শরীরে ক্লান্তির আভাস ৷ চোখে-মুখে ঘুমের হাতছানি ৷ হঠাৎ মোবাইলে কল এলো ৷ পরিচিত নাম্বার ৷ রিসিভ করতেই ভেসে এলো কান্না জড়িত কণ্ঠ ৷ তোমার বাবা অসুস্থ ৷ দ্রুত চলে এসো ৷ কেটে গেলো লাইন ৷ কে দুঃসংবাদ দিলো চিনতে পারলেন না সাজিদ ৷ বুঝার চেষ্টাও করলেন না ৷ সংবাদ শুনেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠলো ৷ পুরো শরীর কাঁপনি দিলো ৷ কোনরকম ব্যাগ গুছিয়ে রওয়ানা দিলেন ৷ বাড়ির পথে ৷ সঙ্গে প্রিয় বন্ধু টুটুল ৷
কাউন্টারে পৌঁছে টিকিট পেলেন সৌভাগ্যক্রমে ৷ রাত বারোটার শেষ গাড়ি এটাই ৷ নির্ধারিত সময়ের পরে বাস এলো ৷ এটা বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যা ৷ কখনো সমাধান হবে কিনা আল্লাহ মালুম ৷ গাড়িতে বসে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললেন টুটুল ৷ কয়েকজনকে কল করলেন সাজিদ ৷ জানতে চাইলেন বাবার প্রকৃত হাল ৷ তাদের একজন বললেন সত্য কথাটা ৷ তার বাবা ইন্তেকাল করেছেন ৷ ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজীউন ৷ মৃত সংবাদ শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় সে ৷ অটোমেটিক চোখে-গালে নামে অশ্রুর মিছিল ৷ টুটুল শান্ত্বনা দেবার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না ৷ শুধু মাঝে মাঝে টিস্যু পেপার এবং পিঠে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে ৷ সিটে হেলান দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে সাজিদ ৷ যেন তার কান্নামুখ অন্য যাত্রীরা দেখতে না পারে ৷
মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সে । ভাই বোনদের মধ্যে সবার ছোট । বাবা আল-আমীন ব্যবসা করেন। ছোটখাটো ব্যবসা ৷ তিনি খুব-ই ধার্মিক মানুষ ৷ নবীজির মতো নিজে বিলাসি জীবন পছন্দ করতেন না ৷ সন্তানদেরকে গড়েছেন সেভাবে ৷ মানুষ করেছেন নিজের মতো করে। তিনি সবসময় বলতেন, দেখো কলিজার টুকরোরা, টাকা উপার্জন করা অনেক কষ্ট। অযথা বিলাসিতা করে টাকা নষ্ট করিও না। জীবনে প্রকৃত মানুষ হওয়াটাই আসল । রবের গোলামি করাটাই মাকসাদ ৷ এটাই সৃষ্টির মূল কারণ ৷
সাজিদরা ছোটকাল থেকে কখনো বাবার মুখে নিজেরদের প্রশংসা করতে শুনেনি ৷ সবসময় কেমন একটা গম্ভীর ভাব নিয়ে থাকতেন তিনি ৷ পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলেও কখনো বেশি উৎসাহ দেখাননি ৷ বলেননি সাবাস ৷ তিনি সবসময় বলেছেন , এটা কোনো রেজাল্ট হলো? আরো ভালো করতে হবে ৷ আরো ভালো ৷ সারাদিন বাইরে থাকা চলবে না ৷ রুটিন মতো পড়ালেখা চালাতে হবে ৷ মাঝে মাঝে সাজিদ অভিমান করতেন বাবার উপর ৷ বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদতেন আর ভাবতেন বাবা এমন কেন? অন্যদের মতো এতো……৷

বাবা টিচারের দেখা করতে যেতেন ৷ সামনে বসে বলতেন সাজিদ তো একদম পড়াশনা করে না। কোন মুরুব্বীদের সাথে দেখা হলে বলতেন , আমার ছেলেটা একদম কথা শোনে না। একটু দোয়া করবেন ৷ তখন অনেক রাগ হতো বাবার উপর। একদিন সে ক্ষিপ্ত হয়ে মায়ের কাছে নালিশ করেছিলেন, আচ্ছা আম্মু বাবা এমন কেন? কোনোদিন আমার প্রশংসা তো দূরে থাক, ভালো করেছো এটা পর্যন্ত বলেন না ৷ বরং, লোকের সামনে আমি খারাপ বলে ছোট করেছেন । মা অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন সেদিন। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেছিলেন আরে পাগল তোমাদের বাবা অনেক ভালো মানুষ ৷ তোমাদের নিজের থেকে বেশি ভালোবাসেন ৷ ব্যবসা-বানিজ্যে আয় রোজগার সবই তো তোমাদের জন্য ৷ রাতের বেলা মা যখন বাবাকে কথাগুলো বলেছিলেন বাবা তখন মুচকি হাসি দেন ৷ পরে গম্ভীর কণ্ঠে বলা আরম্ভ করেন, সন্তানকে ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতে নেই ৷ এটা প্রকাশের বিষয় নয় ৷ আর আমার ছোট ছেলেটা বড় অভিমানী। অতোটা কিন্তু কন্যারা নয় ৷ আমি যে কেন ওর সামনে প্রসংশা করি না সে তো আর জানে না। আমি চাই, সে আরো বড় হোক। আরো ভালো ফলাফল করুক। আমার ছেলের গর্ব আমার গর্ব। আমি যদি তার প্রশংসা করি সবার সামনে, তাহলে তার মনের মধ্যে অহংকার জমে যাবে। আর অহংকার পতনের মূল। আমি চাই না আমার সন্তানের মনে অহংকার জমুক। একদিন সে বুঝবে। যেদিন সে বাবা হবে সেদিন সে ভালো করেই বুঝবে। হায়রে অবুঝ!

সেদিন আর সে কান্না চেপে রাখতে পারেননি ৷ নিজেকে ধিক্কার দিয়েছেন রাতভর। বাবা তাকে কতোটা ভালোবাসেন গভীরভাবে উপলদ্ধি করেছিলেন ৷ আরেকদিনের আরো একটি ঘটনায় ভাল করেই বুঝেছিলেন বাবার ভালোবাসার গভীরতা ৷ একদিন রাতে তিনি প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে উঠেছিলেন ৷ তখন হঠাৎ কান্না মিশ্রিত ফরিয়াদ শুনে এগিয়ে যান ৷ বাবা তাহাজ্জুদ শেষ করেছেন বুঝছে পারেন ৷ বাবার মুনাজাত সে কান পেতে শুনেছিলেন , বাবা বলছেন ,
দয়ার সাগর হে আমার মালিক ! তুমি আমাদের হায়াত বাড়িয়ে দাও ৷ ঈমানে ধনী আমলে ধনী বানাও ৷ দুনিয়া এবং আখিরাতে কামিয়াব করো ৷ আমার সন্তানদের সৎ, যোগ্য আদর্শবান বানিয়ে দিও ৷ বিশেষ করে সাজিদকে আলোকিত মানুষ হওয়ার তাওফিক দাও ৷ আমিন ৷ ছুম্মা আমীন ৷

সেই রাতে তার ভুল ভেঙে যায় ৷ বাবাকে নতুন করে চিনে যেন ৷ ঠিক তখনই বাবাকে আজীবন ভালোবাসার প্রতিজ্ঞা করে নিজে ৷ আর বাবাও আগের মতো থাকেননি ৷ ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছেন ৷ সাজিদের খুব ইচ্ছে ছিলো দেশের বাইরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার। কিন্তু সে বাবাকে ছেড়ে কোথাও এক দিনের জন্য বেড়াতেও যাননি ৷ বগুড়ার ঐতিহাসিক পুনড্রবর্ধন কলেজে লেখাপড়া করেন ৷ সেখানের পাঠ শেষে বাবার নির্দেশে ঢাকায় চলে যান ৷ কলেজে ভর্তি হয়ে চাকরির খোঁজ লাগান ৷ ঘুষ দিয়ে যেখানে চাকরি পাওয়া কঠিন সেখানে সে সহজেই পেয়ে যান ভালো মানের চাকরি ৷ সাজিদ বিশ্বাস করে বাবার খেদমত আর দোয়ার বরকতে চাকরি হয়েছে ৷ এগিয়ে যাচ্ছে সে ৷ তার সব ক্রেডিট বাবার ৷ প্রতি মাসের বেতন সামান্য কিছু রেখে চাকরির টাকা পুরোটাই সে বিকাশে পাঠিয়ে দেন বাবার কাছে ৷ সংসারের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেন ৷ কিন্তু তার দরদী পিতা সব টাকা তার জন্য জমা রেখে দেন ৷ ছেলের অজান্তেই ৷ আরো ছেলের উন্নত ভবিষ্যতের জন্য বিভিন্ন ফিকির করে যান তিনি ৷ সন্তানের জন্য পিতামাতার রয়েছে নিস্বার্থ এক ভালোবাসার পৃথিবী ৷ সে ভালোবাসার কাছে সবকিছুই হার মানে।
আর যোগ্য সন্তানরা বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয় ভালোবাসা শুধু প্রেমিক প্রেমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভালোবাসা থাকে সব মানুষের জন্য। কিন্তু বাবা মায়ের ভালোবাসার কাছে হার মানে প্রিয়তমার উষ্ণ ভালোবাসাও ৷

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে যমুনা ব্রিজের কাছে বাঁধে জ্যাম ৷ এখানে ঐতিহাসিক পর্যায়ের জ্যাম পড়ে ৷ জ্যামে গর্ভবতীর বাচ্চা হওয়ার রেকর্ড পর্যন্ত আছে এখানের ৷ সাজিদ তো গাড়িতে এখনো অতীত স্মৃতির ময়দানে হাঁটছেন ৷ অস্থিরতা প্রকাশ করছেন টুটুল ৷ সেই সাজিদকে প্রায় টেনে নামালেন ৷ তখনই ভেসে এলো ফজরের সুমধুর আযান ৷
কখন যে জ্যাম ছুটে তারা বাড়িতে পৌঁছবে ! কখন বাবাকে শেষবারের মতো দেখবে আর বিদায় জানাবে তা কে জানে ৷ সাজিদ শুধু জানে বাবার কাছে পৌঁছবে ৷ দ্রুত ৷ কিন্তু আর ওয়েট করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই ৷ তাই শেষ পর্যন্ত মসজিদে ছুটলেন ৷ আপাতত নামাজ দোয়া তো করতে পারেন ৷ নামাজ শেষে হাত তুললেন ৷ কান্না জড়িত কণ্ঠে অস্পষ্ট আওয়াজে বললেন – রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সগীরা ….

 

লেখক: আলেম, ছড়াকার ও গল্পকার। 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
copyright 2020: ittehadtimes24.com
Theme Customized BY MD Maruf Zakir